পরীক্ষার দুর্ভোগ নিয়ে ভিডিও, ছাত্রদলের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীর হয়রানির অভিযোগ

ভারী বৃষ্টিতে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা কী দুঃসহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে, তা নিয়ে একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন এক ছাত্রী। সেই পোস্টের পর সাইবার স্পেসে সরকার-সমর্থক রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা তাঁকে হয়রানি করছেন বলে আরেকটি ভিডিওতে অভিযোগ করেছেন তিনি।
ছাত্রীটির ওই ভিডিওর পরিপ্রেক্ষিতে রোকেয়া কালেকটিভ একটি ভুঁইফোড় ফেসবুক পেজে তাঁকে নিয়ে সংবাদপ্রতিবেদনের আদলে প্রকাশিত একটি লেখা খুঁজে পেয়েছে। ওই লেখায় ছাত্রীর বিভিন্ন ব্যক্তিগত ভিডিও প্রেক্ষাপট ছাড়াই উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্যও করা হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, ২৪–পরবর্তী সময়ে নারীর প্রশ্নে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কতটা পরিবর্তন এসেছে।
ভিডিওতে ছাত্রীটিকে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইউনিফর্ম পরে পানি ভেঙে এগোতে দেখা যায়। এ সময় তিনি বাংলাদেশ এবং শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনকে নিয়েও মন্তব্য করেন। তাঁর দাবি, এরপরই তিনি সাইবার স্পেসে বুলিংয়ের শিকার হন।
ভিডিওতে যা বলেছেন ওই ছাত্রী
“ছাত্রদলের কয়েকটা নেতা আমাকে নিয়ে যা-তা করছে। আমাকে ট্রল করছে, গালিগালাজ করছে, স্লাট-শেমিং করছে, হুমকি দিচ্ছে,” কাঁদতে কাঁদতে বলেন ওই ছাত্রী।
“আমি এই ভিডিওটা পোস্ট করছি। এরপর যদি আমার সঙ্গে কিছু হয় বা আমার পরিবারের সঙ্গে কিছু হয়, এর জন্য সম্পূর্ণ দায়ী বিএনপির ছাত্রদল,” তিনি বলেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
‘কোনো আমলেই নারীরা ভালো থাকেননি’
ঘটনাটি সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মিশকাতুল মাশিয়াত বলেন, “কোনো আমলেই নারীরা ভালো থাকেননি।”
মিশকাতুল বলেন, “অনেক নারী শিক্ষার্থীই পিরিয়ড চলাকালে বৃষ্টিতে ভিজে পরীক্ষা দিয়েছেন।”
তাঁর মতে, এ পরিস্থিতি সরকারের পক্ষ থেকে আরও মানবিকভাবে সামলানো যেত। কিন্তু তা না করে যখন একজন নারী শিক্ষার্থী নিজের ক্ষোভ থেকে কিছু কথা বলেছেন, তখন একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীকেও কটূক্তি করতে ছাড়ছে না একটি পক্ষ। অভিযোগকারী ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, এটাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মিশকাতুল বলেন, কলেজে পড়ার সময় ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে তিনি ও অন্য আন্দোলনকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ষণ ও গুমের হুমকি পেয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ, সে সময় তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের কর্মীরা তাঁদের ছবি ও ভিডিওতে মন্তব্য এবং ইনবক্সে এসব হুমকি দিতেন।
মিশকাতুল বলেন, “আমরা দেখেছি, শুধু ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কারণে সুবর্ণচরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এখন সরকারের পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু ছাত্রদল, শিবির কিংবা লীগ, কোনো আমলেই আমি দেখিনি যে কোনো পরিবর্তন হয়েছে।”
তিনি ছাত্রদলের মানসুরা আলমসহ নারী নেত্রীদের কাছ থেকে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করেন।
ছাত্রদলের বক্তব্য
এ বিষয়ে কথা বলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক চেমন ফারিয়া ইসলাম মেঘলা।
তিনি রোকেয়া কালেকটিভকে বলেন, “আমি মনে করি, সাইবার বুলিং যারা করেন, তারা কোনো দল বা গোষ্ঠীর হন না। তারা একটি দলের নামকে সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের নোংরা মানসিকতার প্রকাশ করেন।”
তিনি বলেন, “যেহেতু এগুলো ফৌজদারি অপরাধের মধ্যে পড়ে, আমরা চেষ্টা করব এর বিরুদ্ধে যতটুকু ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নিশ্চিত করতে। সাংগঠনিক পরিচয়ের কেউ জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি জানান, বিভিন্ন ভুলত্রুটির কারণে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বারবার কর্মী বহিষ্কার করেছে। এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে সাত হাজার কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, তাঁর মতে দুই পক্ষেরই কিছু ভুল রয়েছে। ভিডিও আপলোড করা ছাত্রীকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “এই প্রজন্মের মুখের ভাষা এত খারাপ কেন?”
তিনি আরও বলেন, “আমরাও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হই। সে কারণে সাইবার নিরাপত্তার বিষয়ে জোরদার পদক্ষেপ নিতে বিএনপি কাজ করছে।”
‘নারীদের থামানোর প্রধান অস্ত্র চরিত্রহনন’
ঘটনাটি নিয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফার সঙ্গে।
রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের জায়গায় অনেক নারীবিদ্বেষ রয়েছে। যারা প্রচলিত লৈঙ্গিক ভূমিকা, যেমন নারীকে নরম থাকতে হবে, তাঁর নিজস্ব মতামত থাকবে না—এসব ধারণা অমান্য করে রাজনৈতিক মত প্রকাশ করেন, তাঁরাই এই নারীবিদ্বেষের শিকার হন।”
তিনি বলেন, “নারীদের থামানোর জন্য তাদের প্রধান অস্ত্র হলো চরিত্রহনন। তারা মনে করে, কোনো রাজনৈতিক দলের নারী সদস্যদের বুলিং করার মাধ্যমে ওই রাজনৈতিক দলকেই আঘাত করা যায়।”
দায় না নেওয়ার সংস্কৃতির প্রসঙ্গ টেনে সামিনা লুৎফা বলেন, “দায় না নেওয়ার সংস্কৃতি বা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ব্যবহার করে নারীর প্রতি অবমাননাকে আশ্রয় দেওয়া কোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই শেষ পর্যন্ত ভালো নয়। আগেও এটি ভালো কিছু বয়ে আনেনি, এখনও বয়ে আনবে না। কাজেই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত দায় নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।”






