অভিন্ন পারিবারিক আইন কেন? যৌনকর্মকে সত্যিই কমিশন পেশার স্বীকৃতি দিতে বলেছিল?

রোকেয়া কালেকটিভ প্রতিবেদক
অভিন্ন পারিবারিক আইন কেন? যৌনকর্মকে সত্যিই কমিশন পেশার স্বীকৃতি দিতে বলেছিল?

নারী সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরপরই কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে।

মূলত তাদের আপত্তির বিষয় ছিল সব ধর্মের মানুষের জন্য অভিন্ন পারিবারিক আইন, সম্পত্তিতে সমান অধিকার, বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং শ্রম আইনের আওতায় যৌনকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার সুপারিশ। যদিও তারা প্রচার করে, কমিশন নাকি যৌনকর্মকে পেশার স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে।

এ নিয়ে রোকেয়া কালেকটিভ কথা বলেছে নারী সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হকের সঙ্গে।

নারী সংস্কার কমিশন কেন অভিন্ন পারিবারিক আইনের সুপারিশ করেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে কমিশনের প্রধান বলেন, তাঁরা ধর্মীয় আইন বাতিলের কথা বলেননি। বরং ধর্মীয় আইনের পাশাপাশি পারিবারিক বিষয়ে দেশের সব নাগরিক যেন একই ধরনের অধিকার ভোগ করতে পারে, সে জন্য একটি আইনি বিকল্পের প্রস্তাব দিয়েছেন।

“অভিন্ন পারিবারিক আইন বলতে আমরা বুঝিয়েছি, সমাজে হিন্দু, মুসলমানসহ সব ধর্মের নারী-পুরুষের সমতা-ভিত্তিক অধিকার নিশ্চিত করা,” বলেন শিরীন পারভীন হক।

তিনি জানান, তাঁদের প্রস্তাব ছিল, বর্তমানে যে ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইন বহাল রয়েছে, তার অধীনে যারা থাকতে চান, তারা থাকবেন। ধর্মীয় আইন তুলে দেওয়ার কোনো কথাই কমিশন বলেনি।

“আমরা ধর্মীয় আইনের পাশাপাশি একটি সমতা-ভিত্তিক সিভিল অপশন রাখার সুপারিশ করেছি। এমন একটি ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছি, যেখানে যে ধর্মেরই হোক না কেন, সবাই সমান অধিকার নিয়ে বসবাসের সুযোগ পাবে,” যোগ করেন শিরীন পারভীন হক।

যৌনকর্মকে পেশার স্বীকৃতি দেওয়ার কথাও কমিশন বলেনি বলে জানান কমিশনের প্রধান।

“আমরা যৌনকর্মকে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলিনি। বরং বলেছি, যারা যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করছেন, তাঁদের যেন শ্রম আইনের আওতায় আনা হয়,” বলেন শিরীন পারভীন হক।

তিনি বলেন, এর ফলে তাঁরা যদি কোনো ধরনের নিপীড়ন বা নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে আইনের সহায়তা চাইতে পারবেন। মূলত এই চিন্তা থেকেই শ্রম আইনের সুরক্ষা তাঁদের জন্যও নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

শিরীন পারভীন হক বলেন, প্রস্তাব চূড়ান্ত করার আগে তাঁরা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি, জাতিসত্তা ও পেশার নারীদের নিয়ে অসংখ্য পরামর্শসভা করেছেন।

এসব পরামর্শসভায় যৌনকর্মীদের প্রতিনিধিদের অন্যতম দাবি ছিল, তাঁদের যেন শ্রম আইনের আওতায় সুরক্ষা দেওয়া হয়। ধর্ষণ বা অন্য কোনো সহিংসতার শিকার হলে যেন অন্তত বিচার চাওয়ার অধিকার তাঁরা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারেন।

শিরীন পারভীন হক বলেন, একজন যৌনকর্মী বলেই তাঁর সঙ্গে জোরজবরদস্তি বা যৌন সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

কমিশনের সুপারিশ নিয়ে হেফাজতে ইসলামের বিরোধিতা সম্পর্কে শিরীন পারভীন হক বলেন, “আমরা কখনোই কল্পনা করিনি যে সবাই সব সুপারিশের সঙ্গে একমত হবে। আমরাও চেয়েছিলাম আমাদের প্রতিবেদন নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা হোক, সুস্থ বিতর্ক হোক এবং সবার সামনে আমাদের সুপারিশগুলোর বিষয়বস্তু স্পষ্ট হোক।”

তিনি আরও বলেন, তাঁদের আপত্তি ছিল গালাগালি ও আক্রমণাত্মক ভাষা নিয়ে।

“কেউ কারও মতের বিরোধিতা অবশ্যই করতে পারেন। কিন্তু তার জন্য গালাগালি বা নোংরা ভাষায় আক্রমণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়,” বলেন কমিশনের প্রধান।

নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠিত হয় ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর। ২০২৫ সালের এপ্রিলে কমিশন তাদের বহুল আলোচিত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে ৪০০-এর বেশি সুপারিশ ছিল।

তবে প্রতিবেদনটি সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়ার পরপরই কয়েকটি নির্দিষ্ট সুপারিশ ঘিরে একটি পক্ষ বিতর্ক শুরু করে। ফলে কমিশনের পুরো প্রতিবেদন নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা আর এগোয়নি।