ক্ষমতাহীন স্থানীয় সরকারের নারী প্রতিনিধিরা, পরিবর্তনে যেসব প্রস্তাব করেছিল নারী সংস্কার কমিশন

রোকেয়া কালেকটিভ প্রতিবেদক
ক্ষমতাহীন স্থানীয় সরকারের নারী প্রতিনিধিরা, পরিবর্তনে যেসব প্রস্তাব করেছিল নারী সংস্কার কমিশন
নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের এপ্রিলে তাদের বহুল আলোচিত প্রতিবেদন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা জমা দেয় | ছবি: Chief Advisor GOB ফেসবুক পেজ

প্রথম দুই পর্বে নারী সংস্কার কমিশনের সংবিধান, আইন ও নারীর অধিকার এবং নারী উন্নয়নে গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছিল। আজকের তৃতীয় পর্বে থাকছে স্থানীয় সরকার, বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব শক্তিশালী করতে কমিশনের সুপারিশ।

নারী সংস্কার কমিশনের মতে, নারীর রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হতে পারে একটি শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক স্থানীয় সরকারব্যবস্থা। কারণ স্থানীয় সরকারই নাগরিকদের সবচেয়ে কাছের প্রশাসনিক কাঠামো, যেখানে নারীরা সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং স্থানীয় উন্নয়নে ভূমিকা রাখার সুযোগ পান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকার স্থানীয় সরকারব্যবস্থার মাধ্যমে বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় শাসন শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। সংবিধানের ১১ ও ৫৯ অনুচ্ছেদেও স্থানীয় সরকারকে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে বর্তমানে মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রজননস্বাস্থ্যসেবা, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং স্থানীয় পরিকল্পনায় নারীদের সম্পৃক্ত করার বিভিন্ন উদ্যোগ পরিচালিত হচ্ছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে ৩৮টি মাতৃস্বাস্থ্যকেন্দ্র, ১৪৫টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ২৭৬টি স্যাটেলাইট ক্লিনিক পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি ৫৯ হাজারের বেশি দুস্থ নারী কর্মীর মাধ্যমে গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচিতে প্রায় ৬৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের এক-তৃতীয়াংশ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে নারী সভাপতিও রয়েছেন।

সরকার ইউনিয়ন পরিষদে ওয়ার্ড সভা এবং উন্মুক্ত বাজেট সভার ব্যবস্থাও চালু করেছে, যাতে সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে নারীরা স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় মতামত দিতে পারেন।

তবে নারী সংস্কার কমিশনের মতে, আইনে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে স্থানীয় সরকারে নারীদের কার্যকর ভূমিকা এখনও নিশ্চিত হয়নি।

কমিশনের পর্যবেক্ষণে, অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান জনবল ও বাজেটসংকটে রয়েছে। বিভিন্ন আইন ও বিধিমালায় একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বিধান থাকায় দায়িত্ব পালনে জটিলতা তৈরি হয়। আবার বিভিন্ন দায়িত্ব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর কার্যকর জবাবদিহি নেই।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়নে নারীদের অংশগ্রহণের বিধান থাকলেও তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রকল্পনির্ভর। ফলে নারীদের মতামত নিয়মিতভাবে স্থানীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিফলিত হয় না।

কমিশনের মতে, ওয়ার্ড সভা, উন্মুক্ত বাজেট সভা এবং অন্যান্য অংশগ্রহণমূলক কাঠামো চালু থাকলেও সেগুলোর কার্যকারিতা প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এর পেছনে যথাযথ ক্ষমতার অভাব, সীমিত অংশগ্রহণ এবং সদস্য নির্বাচনে পক্ষপাতিত্বকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্বাচনেও বিভিন্ন ত্রুটির কথা উল্লেখ করেছে কমিশন। বিশেষ করে নারী সুবিধাভোগীদের তথ্যসংগ্রহে ঘাটতি, অন্তর্ভুক্তি ও বাদ পড়ার সমস্যা এবং জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত না হওয়ায় অনেক নারী সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একইভাবে বাল্যবিবাহ ও নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকরভাবে পালন করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় একাধিক আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে নারী সংস্কার কমিশন।

কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন বাতিল, একটি স্বাধীন ও স্থায়ী স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন এবং পার্বত্য ও সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত স্থানীয় শাসনব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের আগে আয়োজন, চেয়ারম্যান বা মেয়রকে সরাসরি জনগণের ভোটে নয়, নির্বাচিত সদস্যদের মাধ্যমে নির্বাচনের ব্যবস্থা এবং সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রথম ভাইস-চেয়ারপারসন হিসেবে নারী প্রতিনিধিকে নির্বাচনের সুপারিশও রয়েছে।

স্থানীয় পর্যায়ের পরিকল্পনা ও বাজেটে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কমিশন ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নারী অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছে।

একই সঙ্গে বর্তমানে পৌরসভার স্থায়ী কমিটিতে থাকা ৪০ শতাংশ নারী সদস্যের বিধান ইউনিয়ন পরিষদ ও সিটি করপোরেশনসহ সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে। ওয়ার্ড সভাতেও ৪০ শতাংশ নারী অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রস্তাব রয়েছে।

কমিশনের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণ যেন কেবল প্রকল্পনির্ভর না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দও নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতিবেদনে নারী জনপ্রতিনিধিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যৌতুক, বাল্যবিবাহ, নারী ও শিশু পাচার, পারিবারিক সহিংসতা এবং যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে স্থানীয় সরকারকে আরও সক্রিয় ভূমিকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় সরকারের সমন্বয় জোরদারের কথাও বলা হয়েছে।

নারীদের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার সহজ করতে গ্রাম আদালতকে আরও কার্যকর করা, অভিযোগ শুনানির প্যানেলে অন্তত দুজন নারী রাখা এবং তাঁদের একজনকে নির্বাচিত নারী জনপ্রতিনিধি করার সুপারিশ করেছে কমিশন।

এ ছাড়া প্রতিটি পৌরসভায় বীরাঙ্গনা স্মারক নির্মাণ, নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ জনপরিসর, আলোকিত সড়ক, সিসিটিভি, নারীদের জন্য পৃথক কর্নার, লেডিস পার্ক এবং পর্যাপ্ত শৌচাগারের ব্যবস্থার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কমিশনের সুপারিশে শতভাগ জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করা, জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ ও তালাকের তথ্য ডিজিটালভাবে সংযুক্ত করা, অনলাইনে ট্রেড লাইসেন্সসহ স্থানীয় সেবা প্রদান এবং ইউনিয়নভিত্তিক নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী সুবিধাভোগীদের তথ্যভান্ডার তৈরির কথা বলা হয়েছে। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার চালুর প্রস্তাবও রয়েছে।

কমিশনের মতে, নারীর ক্ষমতায়নে শুধু সংরক্ষিত আসন বাড়ানো যথেষ্ট নয়। স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, পর্যাপ্ত বাজেট, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান এবং এমন একটি বিকেন্দ্রীকৃত প্রশাসনিক কাঠামো, যেখানে স্থানীয় উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে নারীর মতামত ও নেতৃত্ব সমান গুরুত্ব পাবে।