মেনোপজের যে উপসর্গটি এখনো আলোচনার বাইরে

ডা. সারাহ বার্গ
মেনোপজের যে উপসর্গটি এখনো আলোচনার বাইরে

কর্মক্ষেত্রে মেনোপজ নিয়ে একটি সেশনে কথা বলছিলাম। একই প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা অনলাইনে যুক্ত ছিলেন। আলোচনায় উঠে এসেছিল মেনোপজের পরিচিত উপসর্গগুলো, যেমন হট ফ্ল্যাশ, ঘুমের সমস্যা, হঠাৎ মানসিক ঝাপসাভাব বা ব্রেইন ফগ। এরপর এরপর আলোচ্যসূচির বাইরে একটি বিষয় তুললাম। বললাম, পেরিমেনোপজের সময় অনেক নারীর আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ কমে যেতে পারে। এর প্রভাব বর্ণবাদ ও বৈষম্যের মুখে থাকা কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিগত গোষ্ঠীর নারীদের কর্মজীবনে আরও বেশি পড়তে পারে। কারণ, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের আগেই তাঁদের নানা ধরনের পক্ষপাত ও বৈষম্যের বাস্তবতার মধ্য দিয়ে চলতে হয়।

আমার কথা শেষ হতেই একজন নারী চোখ বন্ধ করলেন। তারপর আরেকজন। এরপর আরও কয়েকজন। কিছুক্ষণের মধ্যেই পর্দাজুড়ে একের পর এক সম্মতির মাথা নাড়ানো দেখা গেল। যেন সবাই একই অভিজ্ঞতার সাক্ষী।

সেই মুহূর্তে আবারও উপলব্ধি করলাম, চিকিৎসক হিসেবে বহু বছর ধরে যা দেখে আসছি, তা নিয়ে আমরা যথেষ্ট কথা বলিনি। মেনোপজ নিয়ে জনপরিসরের আলোচনায় এমন সব উপসর্গই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, যেগুলো সহজে চিহ্নিত করা যায়। অথচ যে উপসর্গটি অনেক নারীর ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে সবচেয়ে বড় অভিঘাত তৈরি করছে, সেটিই প্রায় অনালোচিত রয়ে গেছে।

অবশ্য ইতিবাচক পরিবর্তনও শুরু হয়েছে। মেনোপজ নিয়ে গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত জুনে মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস নারীর স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা ও সচেতনতায় ২১ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেন। একই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর বব ফার্গুসন সরকারি সংস্থাগুলোকে কর্মক্ষেত্রে মেনোপজ–সংক্রান্ত সহায়তা অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন। আর ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে এমন একটি বিল এগিয়ে নেওয়া হয়েছে, যাতে মেনোপজ–সম্পর্কিত সমস্যায় কর্মীদের জন্য যুক্তিসংগত কর্মপরিবেশগত সুবিধা নিশ্চিত করতে নিয়োগকর্তাদের বাধ্য করার প্রস্তাব রয়েছে।

তবু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো আলোচনার বাইরে রয়ে গেছে। সেটি হলো পেরিমেনোপজের সময় অনেক নারীর অনুভূত তীব্র রাগ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে সাধারণত ইরিটেবিলিটি বা খিটখিটে মেজাজ বলা হয়, আমার রোগীরা সেটিকে বর্ণনা করেন ‘রাগের বিস্ফোরণ’ হিসেবে।

তাঁদের অভিজ্ঞতা শুধু সাময়িক বিরক্তি নয়। তাঁরা এমন এক তীব্র আবেগের কথা বলেন, যা পরিস্থিতির তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, তাঁরা আর নিজের প্রতিক্রিয়াকে আগের মতো চিনতে পারেন না। মনে হয়, নিজের আচরণও যেন নিজের কাছে অপরিচিত হয়ে গেছে।

এই বিষয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা নতুন নয়। কয়েক দশক ধরেই জানা গেছে, মস্তিষ্কে মেজাজ ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণকারী নিউরোট্রান্সমিটারগুলোর ভারসাম্য বজায় রাখতে ইস্ট্রোজেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পেরিমেনোপজে এই হরমোনের ওঠানামা শুরু হলে সেই স্নায়ুব্যবস্থাও ব্যাহত হয়, অনেক সময় হঠাৎ করেই।

মেনোপজে উত্তরণের ওপর বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা স্টাডি অব উইমেন’স হেলথ অ্যাক্রস দ্য নেশন (SWAN) দেখিয়েছে, পেরিমেনোপজে নারীদের মধ্যে বিষণ্নতার তীব্র উপসর্গ আগের সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। প্রায় তিন হাজার নারীকে ১০ বছর অনুসরণ করা আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁদের আগে উদ্বেগজনিত কোনো ইতিহাস ছিল না, তাঁদের মধ্যেও পেরিমেনোপজের সময় ও পরে খিটখিটে মেজাজ, অকারণ উদ্বেগ, ভয় এবং হঠাৎ হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। হট ফ্ল্যাশ, মানসিক চাপ ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই সম্পর্ক অটুট ছিল।

অর্থাৎ প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু যা নেই, তা হলো পেরিমেনোপজজনিত তীব্র রাগকে আলাদা একটি চিকিৎসাগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করার স্বীকৃত নির্দেশিকা, রোগ নির্ণয়ের মানদণ্ড, এমনকি একটি স্বতন্ত্র পরিচয়ও।

২০১৮ সালে দ্য মেনোপজ সোসাইটির প্রকাশিত নির্দেশিকায় পেরিমেনোপজ–সম্পর্কিত বিষণ্নতা শনাক্ত ও চিকিৎসার সুপারিশ থাকলেও রাগ বা রেজ নিয়ে আলাদা কোনো নির্দেশনা নেই। বেশির ভাগ গবেষণাতেই খিটখিটে মেজাজকে উদ্বেগের একটি উপসর্গ হিসেবে দেখা হয়েছে, স্বতন্ত্র সমস্যা হিসেবে নয়।

তবে এ বিষয়ে নতুন গবেষণা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের অর্থায়নে পেরিমেনোপজের সময় খিটখিটে মেজাজের স্নায়ুবৈজ্ঞানিক কারণ নিয়ে একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করছে। গবেষকদের মতে, পেরিমেনোপজে মানসিক সমস্যায় ভোগা অধিকাংশ নারীর কাছে সবচেয়ে কষ্টের বিষয় বিষণ্নতা নয়, বরং তীব্র বিরক্তি ও রাগ। কিন্তু যে রাগের কারণে কেউ বিমানে উঠতে ভয় পান, নেতৃত্বের পদ ছেড়ে দেন বা নিজের আচরণের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন, সেই অভিজ্ঞতার জন্য এখনো কোনো স্বীকৃত চিকিৎসা নির্দেশিকা নেই। বাস্তব সমস্যা হিসেবে এর অস্তিত্ব স্বীকৃত হলেও, স্বতন্ত্র চিকিৎসাগত বিষয় হিসেবে এটি এখনো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি।

কয়েক বছর আগে আমার এক রোগীর কথা মনে পড়ে। শ্বেতাঙ্গ এই নারী আমার সামনে বসে ছিলেন মাথা নিচু করে। একসময় তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত, কর্মসূত্রে নিয়মিত ভ্রমণ করতেন, পরিবার আর কাজের নানা অভিজ্ঞতা শোনাতেন। কিন্তু সেদিন তিনি প্রায় চোখই তুলছিলেন না।

তিনি বললেন, ‘আমি এখন বিমানে উঠতে ভয় পাই। মনে হয়, ভেতরে ভেতরে বিস্ফোরিত হচ্ছি।’

নিয়মিত ভ্রমণের প্রয়োজন ছিল বলে তিনি নেতৃত্বের একটি পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। কাজটি করার সক্ষমতা তাঁর ছিল। কিন্তু ৩০ হাজার ফুট ওপরে নিজের আবেগকে আর বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই হঠাৎ তীব্র রাগ এসে যেত। সবচেয়ে বেশি ভয় পেতেন এই ভেবে যে, কখন সেই রাগের বিস্ফোরণ ঘটবে, তিনি নিজেই জানেন না। অথচ এর সঙ্গে পেরিমেনোপজের সম্পর্ক থাকতে পারে, এমন কথা তাঁকে আগে কেউ বলেননি। তাই তিনি নিজেও কখনো সেই সংযোগটি বুঝতে পারেননি।

চিকিৎসক হিসেবে আমি প্রায়ই এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই। অনেক নারী তাঁদের মেজাজের এই পরিবর্তনকে ব্যক্তিগত দুর্বলতা বা ব্যর্থতা বলে মনে করেন। এমন একটি জৈবিক পরিবর্তনের প্রভাবে তাঁরা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, যার কোনো ব্যাখ্যাই তাঁদের জানা থাকে না। আমি নিজে থেকে প্রশ্ন না করলে খুব কম নারীই এ বিষয়ে কথা বলেন।

তবে এই নীরবতা সবার ক্ষেত্রে একই রকম নয়। আর সেখানেই যেকোনো নীতিগত উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আমার আরেক রোগী, চল্লিশের কোঠায় একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী, পেশাগত জীবনে সব সময় অত্যন্ত সতর্ক ও সংযত আচরণ করে এগিয়েছেন। তিনিও একই ধরনের আকস্মিক রাগ ও উদ্বেগের কথা বলছিলেন। একপর্যায়ে তিনি এমন একটি কথা বললেন, যা আজও আমার মনে গেঁথে আছে।

‘আমাকে কখনোই রাগান্বিত হিসেবে দেখা চলবে না। কখনোই না।’

কর্মক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের প্রতি প্রত্যাশা এবং তাঁদের মূল্যায়নের মানদণ্ড শ্বেতাঙ্গ সহকর্মীদের তুলনায় আলাদা। এমনকি যেসব কর্মপরিবেশে রাগ বা বিরক্তি স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে মেনে নেওয়া হয়, সেখানেও কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের জন্য সেই সুযোগ সমান নয়।

সমাজবিজ্ঞানী অ্যাডিয়া হার্ভে উইংফিল্ড দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করেছেন কর্মক্ষেত্রে বর্ণভিত্তিক আবেগ প্রকাশের অলিখিত নিয়ম নিয়ে। তাঁর গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ নারীরা রাগ প্রকাশ করবেন কি না, তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করেন। কারণ তাঁরা জানেন, সামান্য আবেগ প্রকাশও তাঁদের সম্পর্কে আগে থেকেই থাকা নেতিবাচক ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।

ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের নতুন নির্দেশনা এবং ইলিনয়ের প্রস্তাবিত বিল মূলত মেনোপজের শারীরিক উপসর্গ মোকাবিলায় জোর দিয়েছে। যেমন কর্মক্ষেত্রের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, নমনীয় কর্মঘণ্টা এবং পেশাগত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নিশ্চিত করা। এসব উদ্যোগ অবশ্যই প্রয়োজনীয় এবং অনেক দেরিতে হলেও এসেছে। কিন্তু কর্মজীবনে গভীর প্রভাব ফেলা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ, যার জন্য এখনো কোনো চিকিৎসা নির্দেশিকাই নেই, যদি আলোচনার বাইরে থেকে যায়, তাহলে এসব উদ্যোগ পূর্ণাঙ্গ হবে না।

অনেক নারী নেতৃত্বের পদ ছেড়ে দিচ্ছেন, নতুন সুযোগ থেকে সরে আসছেন এবং ধীরে ধীরে নিজের বিচারবোধের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন। অথচ এর পেছনে রয়েছে এমন একটি জৈবিক পরিবর্তন, যার কথা তাঁদের কেউ কখনো বলেনি।

পেরিমেনোপজের সময় তীব্র রাগ নারীদের কর্মজীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে গবেষণা এখনো খুব সীমিত। এর একটি কারণ, মধ্যবয়সী নারীদের কর্মস্বাস্থ্য নিয়ে সামগ্রিক গবেষণাই অপ্রতুল। আরেকটি কারণ, এই রাগকে এখনো স্বতন্ত্র গবেষণার বিষয় হিসেবে খুব কমই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মেনোপজের অন্য উপসর্গগুলোকে যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা শুরু হয়েছে, পেরিমেনোপজের তীব্র রাগকেও একই গুরুত্বে দেখা দরকার।

ডা. সারাহ বার্গ একজন চিকিৎসক এবং সেলফোরিটি (Selfority)-এর প্রতিষ্ঠাতা।

সূত্র: টাইম