সংবিধান, আইন ও নারীর অধিকার প্রশ্নে নারী সংস্কার কমিশন কি প্রস্তাব করেছিল?

নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠিত হয় ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বরে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে এ কমিশন তাদের বহুল আলোচিত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে সুপারিশের সংখ্যা ছিল ৪শ'র বেশি।
তবে প্রতিবেদনটি সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়ার পরপরই কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রস্তাব ঘিরে একটি পক্ষ বিতর্ক শুরু করে। ফলে কমিশনের পুরো প্রতিবদেন নিয়ে আলোচনা আর এগোয়নি।
নারী সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরিন পারভীন হক রোকেয়া কালেকটিভকে বলেন, "আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে অনেক আশা নিয়ে প্রস্তাবনাগুলো দিয়েছিলাম। নারীরা আগের সরকারের সময়েও ভালো ছিল না, এখনও নেই। আমাদের সংগ্রাম চলছেই। এই পথ মসৃণ করতে সরকারের আরও জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন।"
পাঠকদের জন্য রোকেয়া কালেকটিভ কমিশনের সুপারিশের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ কয়েক পর্বে প্রকাশ করবে। আজ থাকছে সংবিধান, আইন ও নারীর অধিকার : সমতা ও সুরক্ষার ভিত্তি অধ্যায়ে উল্লিখিত কিছু বিষয়।
অভিন্ন পারিবারিক আইন: কমিশন একটি অভিন্ন পারিবারিক প্রণয়নের কথা বলে। এতে বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, অভিভাবকত্ব ও উত্তরাধিকারসহ পারিবারিক বিষয়ে সব ধর্মের মানুষের জন্য সমতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে প্রযোজ্য হবে।
এ ছাড়া কমিশন সব পারিবারিক বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত ফাস্ট-ট্র্যাক সিভিল পারিবারিক আদালত গঠন এবং ধর্মভিত্তিক বৈষম্য দূর করে নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করার প্রস্তাব করেছিল।
তারা একই সঙ্গে ব্যক্তির সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে একটি অভিন্ন ভরণপোষণ নীতিমালা প্রণয়নের কথা বলে। প্রস্তাব ছিল ভরণপোষণ, দেনমোহর ও অন্যান্য আর্থিক মামলায় আপিল করতে সংশ্লিষ্ট অর্থের ৪০ শতাংশ আদালতে জমা দিতে হবে।
মুসলিম পারিবারিক আইন : এ প্রস্তাবনায় মুসলিম পারিবারিক আইন, মুসলিম বিবাহ আইন ও বিশেষ বিবাহ আইন সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এতে বিবাহবিচ্ছেদ নিবন্ধনের আগে সালিশি পরিষদের মাধ্যমে আর্থিক নিষ্পত্তি, উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে বাধ্যতামূলক সালিশ এবং দেনমোহর, সন্তানের হেফাজত ও ক্ষতিপূরণ বিষয়ে সিদ্ধান্তের বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে।
সেইসাথে ১০ বছরের বেশি স্থায়ী বিবাহ স্বামীর উদ্যোগে বিচ্ছেদ হলে স্ত্রীকে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা, ভরণপোষণ-সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তির জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাসের সময়সীমা নির্ধারণ, স্বয়ংক্রিয় বেতন কাটার মাধ্যমে ভরণপোষণ নিশ্চিত করা, বিবাহবিচ্ছেদের আগে বাধ্যতামূলকভাবে দেনমোহর পরিশোধের কথা বলেছে কমিশন।
দেনমোহর-সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ফাস্ট-ট্র্যাক পারিবারিক আদালত গঠন এবং মামলা দায়েরের এক বছরের মধ্যে অন্তত ৫০ শতাংশ দেনমোহর পরিশোধের বিধান করার সুপারিশ করা হয়েছে।
হিন্দু ব্যক্তিগত আইন : কমিশন হিন্দু নারীদের সম্পত্তির আইনি স্বীকৃতি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন, ২০১২ সংশোধন করে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করে।
তাছাড়া বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার নিশ্চিত করতে বিবাহবিচ্ছেদ-সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করা, নারীর ভরণপোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে পৃথক বাসস্থান ও ভরণপোষণ অধিকার আইন, ১৯৪৬ সংশোধন করে আইন প্রণয়ন করার কথাও তারা বলে।
খ্রিস্টান ব্যক্তিগত আইন : এই সংস্কারের আওতায় বিবাহবিচ্ছেদ আইন সংস্কার করে পুরুষের মতো নারীরও সমানভাবে বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর নারীর আর্থিক স্থিতিশীলতা, ভরণপোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার নিশ্চিত করতে আইন সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া উত্তরাধিকার আইনে খ্রিস্টান নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫ সংশোধনের সুপারিশ করা হয়েছে।
সন্তানের হেফাজত : কমিশনের সুপারিশে, সন্তানের বিষয়ে মাকে বাবার সমান অভিভাবক ও হেফাজতের অধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বাবা অনুপস্থিত বা দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে মাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনগত অভিভাবক করার কথা বলেছে কমিশন।
পাশাপাশি একক মা বা অন্য আইনগত অভিভাবক যেন সন্তানের হেফাজত করার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার না হন, সে জন্য জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টে তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার এবং এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের সুপারিশ ছিল কমিশনের।
একই সঙ্গে যৌথ হেফাজতের ব্যবস্থা চালু, কর্মজীবী মাকে অভিভাবক হিসেবে অযোগ্য বিবেচনা না করা, অভিভাবকত্ব নির্ধারণে শিশুর কল্যাণ ও পারিবারিক সহিংসতার ইতিহাসকে গুরুত্ব দেওয়া, পারিবারিক আদালতের সংখ্যা বাড়ানো এবং পিতৃহীন নাবালক সন্তানের সম্পত্তির ক্ষেত্রে মায়ের আইনগত অভিভাবকত্ব নিশ্চিত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
যৌন হয়রানি রোধ : সুপারিশে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী যৌন হয়রানি, যৌন নিপীড়ন ও স্টকিংয়ের স্পষ্ট সংজ্ঞা দিয়ে আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে।
সেই সাথে যৌনপেশাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করে শ্রম আইনে স্বীকৃতি দেওয়া এবং যৌনকর্মীদের স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ধর্ষণ আইন সংস্কার করে লিঙ্গ, যৌন পরিচয়, ধর্ম, বর্ণ, জাতি, জাতীয়তা, প্রতিবন্ধিতা বা বয়স নির্বিশেষে সব ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, ধর্ষণের সংজ্ঞা স্পষ্ট করার কথা বলে কমিশন। তারা ধর্ষকের সঙ্গে ভুক্তভোগীর বিয়ে আইনিভাবে নিষিদ্ধ করা এবং বারবার ধর্ষণের অপরাধে দোষীদের যৌন অপরাধীর নিবন্ধিত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেয়।
কমিশনের প্রস্তাবে বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ককে ধর্ষণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে আইন সংশোধন করার সুপারিশও উঠে এসেছে।
বাল্যবিবাহ : বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ এবং বিধিমালা, ২০১৮ । এ আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়ে প্রতিটি বাল্যবিবাহের কঠোর ও নিয়মিত তদারকির কথা বলা হয়েছে।
আর একই সাথে আইনে উল্লেখিত ‘বিশেষ প্রেক্ষাপট’ ধারাটি পুনর্বিবেচনা করে কোন বয়সের শিশুর ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য হবে তা স্পষ্ট করা এবং অপব্যবহার ঠেকাতে যৌক্তিক শর্ত যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।







