পুরুষ উত্তরাধিকার মাত্র তিনজন, তবু জাপানে নারী সম্রাটে আপত্তি

রোকেয়া কালেকটিভ ডেস্ক
পুরুষ উত্তরাধিকার মাত্র তিনজন, তবু জাপানে নারী সম্রাটে আপত্তি
ইম্পেরিয়াল প্রাসাদে রাজ পরিবারের সাথে জাপানের সম্রাট নারুহিতো (বাম থেকে তৃতীয়) | ছবি: getty images

জাপানে বর্তমান সরকারপ্রধান একজন নারী। কিন্তু একই সময়ে রাজপরিবারের উত্তরাধিকার–সংকট মোকাবিলায় এমন একটি আইন আনা হচ্ছে, যেখানে কোনো নারীর সম্রাট হওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি।

উত্তরাধিকারীর সংখ্যা কমে এলেও পুরুষতান্ত্রিক উত্তরাধিকারব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রাখার এই উদ্যোগ দেশটিতে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

বর্তমানে জাপানের সম্রাটের সিংহাসন, যা ‘ক্রিস্যান্থেমাম থ্রোন’ নামে পরিচিত, তার বৈধ উত্তরাধিকারী মাত্র তিনজন। তাঁদের মধ্যে দুজনের বয়স ৬০ বছরের বেশি। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন রাজতন্ত্র এখন গুরুতর উত্তরাধিকার–সংকটে পড়েছে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাপানের রাজতন্ত্রে কেবল পুরুষদেরই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ব্যবসা, রাজনীতি ও সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও পুরুষের প্রাধান্য রয়েছে। রাজপরিবারের উত্তরাধিকারব্যবস্থাও সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।

তবে এই নিয়মই এখন বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো রাজতন্ত্রটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কারণ, গত কয়েক দশকে রাজপরিবারে পুত্রসন্তানের তুলনায় কন্যাসন্তানের সংখ্যাই বেশি।

উত্তরাধিকারীর সংকট কাটাতে সরকার রাজপরিবারের মূল বংশের বাইরে থাকা, সরাসরি উত্তরাধিকারী নন এমন দূরসম্পর্কের রাজবংশীয় পুরুষ সদস্যদের আবার উত্তরাধিকারব্যবস্থার আওতায় আনার প্রস্তাব দিয়েছে। এর মাধ্যমে পুরুষ উত্তরাধিকারীর সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাবটি বর্তমানে সংসদের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

তবে সরকারের এই উদ্যোগের পর গবেষক, বিরোধী রাজনীতিক ও সাধারণ মানুষের একাংশ প্রশ্ন তুলছেন, নারীদেরই বা সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হতে দেওয়া হবে না কেন?

993d1162-3d15-4d1e-ae75-2ca224bb2890

‘নারীদের বাদ দেওয়ার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই’

টোকিওর চুও বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজবংশ–বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক মাকোতো ওকাওয়া বলেন, কোনো নারীকে সম্রাট হওয়ার সুযোগ না দেওয়ার পক্ষে যুক্তিসংগত কোনো ভিত্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন।

জাপানের ইতিহাসে আগে আটজন নারী সম্রাট ছিলেন। তাঁদের বেশির ভাগই দায়িত্ব নিয়েছিলেন তখন, যখন সম্ভাব্য পুরুষ উত্তরাধিকারীরা বয়সে ছোট ছিলেন। তবে ১৮৮৯ সালে মেইজি যুগে ‘ইম্পেরিয়াল হাউস আইন’ প্রণয়নের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে নারীদের সম্রাট হওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ওকাওয়ার মতে, ওই আইন থাকলেও জাপানের সংবিধানে কোথাও নারীদের সিংহাসনে বসার ওপর নিষেধাজ্ঞা নেই। তাই নারীদের বাদ দেওয়াকে জাপানের ঐতিহ্য বলেও দাবি করা যায় না।

তাঁর ভাষায়, ‘নারীদের আগেভাগেই সম্রাট হওয়ার অযোগ্য বলে ধরে নেওয়া আসলে নারীবিদ্বেষ ছাড়া আর কিছু নয়।’

বিভিন্ন জনমত জরিপেও দেখা গেছে, অধিকাংশ জাপানি নারী সম্রাটের ধারণাকে সমর্থন করেন।

টোকিওর বাসিন্দা কানা সাকাকুরা বলেন, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের অনেক দেশেই দীর্ঘদিন ধরে নারী রাজপ্রধান রয়েছেন।

তাঁর ভাষায়, ‘অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে মনে হয়, জাপানে এখনো নারীদের নেতৃত্বে আসার বিষয়ে একধরনের অনীহা রয়েছে।’

সরকার এখনো অনড়

তবে নারী উত্তরাধিকার নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং তাঁর দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এ বিষয়ে সবচেয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

এ বছরের সংসদীয় আলোচনায় তাকাইচি বলেন, সম্রাট হওয়ার যোগ্যতা রাজবংশের পুরুষ বংশধরদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা এখনো যথাযথ।

সরকারের প্রস্তাবিত সংশোধনী, যা চলতি মাসেই আইনে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাতে কোনো রাজকুমারীর সিংহাসনে বসার সুযোগ রাখা হয়নি। এমনকি কোনো রাজকুমারী সাধারণ নাগরিককে বিয়ে করলে তাঁর সন্তানরাও উত্তরাধিকারী হতে পারবেন না। অথচ রাজপরিবারের সদস্যসংখ্যা এতটাই কমে এসেছে যে তাঁদের সাধারণ নাগরিককে বিয়ে করাই এখন প্রায় অনিবার্য।

যদিও জাপানের রাজপরিবারের ভূমিকা মূলত আনুষ্ঠানিক, তবু ১২ কোটি ৩০ লাখ মানুষের এই দেশে তারা জাতীয় ঐক্যের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক। জাপানি পুরাণে রাজপরিবারকে সূর্যদেবীর বংশধর বলে বিশ্বাস করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের পুনর্গঠনের দায়িত্বে থাকা মার্কিন সেনাপ্রধান ডগলাস ম্যাকআর্থার একবার এক বার্তায় লিখেছিলেন, ‘সম্রাট এমন একটি প্রতীক, যিনি সব জাপানিকে ঐক্যবদ্ধ করেন। তাঁকে সরিয়ে দিলে জাতিটিই ভেঙে পড়বে।’

কীভাবে ছোট হয়ে গেল রাজপরিবার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে উত্তরাধিকারী নির্বাচন এতটা জটিল ছিল না।

তখন রাজপরিবার অনেক বড় ছিল। মূল রাজবংশের বাইরে ‘ওকে’ নামে পরিচিত কয়েকটি দূরসম্পর্কের রাজবংশীয় পরিবারও ছিল। মূল বংশে উত্তরাধিকারী না থাকলে সেখানকার পুরুষ সদস্যদের মধ্য থেকেও সম্রাট নির্বাচন করা যেত।

কিন্তু ১৯৪৭ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির চাপে সরকার ইম্পেরিয়াল হাউস আইন সংশোধন করে। রাজপরিবারের সদস্যসংখ্যা কমিয়ে আনা হয়, পাশাপাশি রাজপরিবারের ব্যয়ও কমানো হয়।

এর ফলে সম্রাট হিরোহিতোর নিকটাত্মীয়দের মধ্যেই রাজপরিবার সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। মূল বংশের বাইরে থাকা ১১টি দূরসম্পর্কের রাজবংশীয় পরিবার রাজপরিবারের বাইরে চলে যায়। সেখান থেকেই বর্তমান উত্তরাধিকার–সংকটের সূচনা।

একসময় ৬৭ সদস্যের রাজপরিবার এখন কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৬ জনে। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে আরেকটি নিয়ম। কোনো রাজকুমারী সাধারণ নাগরিককে বিয়ে করলে তাঁকে রাজপরিবার ছাড়তে হয়।

সরকারের নতুন পরিকল্পনা

সরকার এখন প্রস্তাব করেছে, রাজপরিবারের মূল বংশের বাইরে থাকা সেই দূরসম্পর্কের রাজবংশীয় পরিবারগুলোর ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী, অবিবাহিত ও নিঃসন্তান পুরুষ সদস্যদের আবার রাজপরিবারে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তাঁদের সন্তানরাও ভবিষ্যতে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হতে পারবেন।

বর্তমান সম্রাট নারুহিতোর একমাত্র সন্তান জনপ্রিয় রাজকুমারী আইকো। কিন্তু নারী হওয়ায় আইন অনুযায়ী তিনি সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হতে পারেন না।

২৪ বছর বয়সী আইকোর ভবিষ্যতে ছেলে সন্তান হলেও সেই সন্তানও সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হওয়ার সুযোগ পাবে না।

বর্তমানে সম্রাটের বৈধ উত্তরাধিকারী তিনজন। তাঁরা হলেন সম্রাটের ৯০ বছর বয়সী চাচা হিতাচি, ৬০ বছর বয়সী ছোট ভাই আকিশিনো এবং আকিশিনোর ১৯ বছর বয়সী ছেলে হিসাহিতো। হিসাহিতোই এখন সবচেয়ে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সম্রাট। গত ৪০ বছরে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া তিনিই রাজপরিবারের প্রথম পুরুষ সদস্য।

রাজপরিবারের সদস্যসংখ্যা কমে যাওয়া এবং সদস্যদের বয়স বেড়ে যাওয়ায় সরকারি ও আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনও কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই নতুন আইনে রাজকুমারীরা সাধারণ নাগরিককে বিয়ে করার পরও রাজপরিবারে থেকে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তবে তাঁদের ছেলেরা সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হওয়ার সুযোগ পাবেন না।

অধ্যাপক ওকাওয়ার মতে, এসব উদ্যোগ কেবল সাময়িক সমাধান।

তিনি বলেন, ‘যত দিন নারীদের উত্তরাধিকার থেকে বাদ রাখা হবে, তত দিন রাজসিংহাসনের স্থায়ী ও টেকসই উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা কঠিন হবে।’

‘ঐতিহ্য রক্ষা করতেই হবে’

তবে অনেকের মতে, পুরুষ উত্তরাধিকারব্যবস্থা বজায় রাখাই জাপানের দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতার ভিত্তি।

রাজপরিবারের সাবেক এক দূরসম্পর্কের রাজবংশীয় পরিবারের বংশধর সুনেয়াসু তাকেদা বলেন, ‘যাঁরা নারী উত্তরাধিকারকে সমর্থন করেন, তাঁরা হয়তো এটিকে সমস্যা মনে করেন না। কিন্তু আমি মনে করি, পিতৃসূত্রে চলে আসা উত্তরাধিকারব্যবস্থা বজায় রাখা উচিত। এটি পরিবর্তন হলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে।’

নতুন আইনের আওতায় তিনি রাজপরিবারে ফিরতে পারবেন না, কারণ তিনি ইতিমধ্যে বিবাহিত। তবে তাঁর ছেলে ১৫ বছর বয়সে পৌঁছালে যোগ্য হতে পারে। যদিও তাকেদা চান, তাঁর ছেলে পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্বই নিক।

তাঁর মতে, জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে শতাব্দীপ্রাচীন এই ঐতিহ্য বদলে দেওয়া উচিত নয়।

তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ভোটে অল্প ব্যবধানে কোনো সিদ্ধান্ত হলেও যদি জনগণের একটি অংশ সম্রাটকে স্বীকৃতি না দেয়, তাহলে রাজতন্ত্রের প্রতি সম্মান নষ্ট হবে। এতে জাপানের ভিত্তিই নড়ে যাবে।’

তবে টোকিওর বাসিন্দা আকিও কুবোতার মত ভিন্ন।

তিনি বলেন, ‘জাপানের ইতিহাসে নারী সম্রাট ছিলেন।’

তাঁর ভাষায়, ‘আজকের পৃথিবীতে আমরা লিঙ্গসমতার কথা বলি। সে ক্ষেত্রে শুধু সম্রাটের পদটি কেন কেবল পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত।'

সূত্র: সিএনএন